সোম. সেপ্টে ২১, ২০২০

দৈনিক আজকের বাংলাদেশ

সত্য প্রকাশে আপোষহীণ…

না’গঞ্জ সোনাকান্দা দুর্গ এখন শুধু ইতিহাসের পাতায় লিপিবন্ধ

আজকের বাংলাদেশ রির্পোট:

সোনাকান্দা দুর্গ শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বতীরে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দরে অবস্থিত একটি মুগল জলদুর্গ। হাজীগঞ্জ দুর্গের প্রায় বিপরীত দিকে এ দুর্গের অবস্থান। নদীপথে ঢাকার সাথে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ নদীপথগুলির নিরাপত্তা বিধানের জন্য মুগলগণ কতকগুলি জলদুর্গ নির্মাণ করেছিলেন, সোনাকান্দা দুর্গ তার অন্যতম।

যেভাবে সোনাকান্দা নাম করণ:-

মুঘল আমলে নির্মিত একটি জল দুর্গ।এটি ১৬৫০ সালের দিকে তৎকালীন বাংলার সুবেদার মীর জুমলা কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সোনাকান্দা দূর্গটি বাংলার বার ভূঁইয়াদের অন্যতম ঈশা খাঁ তৎকালীন সময়ে ব্যবহার করতেন। রাজা কেদার রায়ের মেয়ে স্বর্ণময়ী এসেছিলেন লাঙ্গলবন্দে পুণ্যস্নান করতে। একদল ডাকাত স্বর্ণময়ীর বজরায় হানা দেয়। প্রচুর স্বর্ণালংকারসহ স্বর্ণময়ীকে অপহরণ করে। পরে ঈশা খাঁ তাঁকে উদ্ধার করে কেদার রায়ের কাছে ফেরত পাঠাতে চান। কিন্তু মুসলমানের তাঁবুতে রাত কাটানোয় জাত গেছে_এ অভিযোগে কেদার রায় স্বর্ণময়ীকে আর ফেরত নেননি। এ খবর শুনে স্বর্ণময়ী কেল্লার তাঁবুতে দিনের পর দিন কেঁদে কেঁদে কাটিয়েছেন। আর তাই এর নাম হয় সোনার কান্দা বা সোনাকান্দা।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর -এর অধীনে বেশ কয়েকবার এ দুর্গের সংস্কার কার্য সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিরক্ষা দেওয়াল এবং শক্তিশালী কামান স্থাপনার জন্য উত্তোলিত মঞ্চটি এখনও পূর্বের অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে। চতুর্ভুজাকৃতির এ দুর্গ আয়তনে ৮৬.৫৬ মি ৫৭.০ মি এবং ১.০৬ মি পুরু দেওয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত যার উচ্চতা ৩.০৫ মি। দেওয়ালের তলদেশ নিরেটভাবে তৈরি। বৃত্তাকার কামান স্থাপনা মঞ্চটির পশ্চিম দিকে সিঁড়ি আছে, যা উত্তোলিত মঞ্চ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ উঁচু মঞ্চে প্রবেশের জন্য পাঁচ খাঁজবিশিষ্ট খিলানযুক্ত প্রবেশ পথ রয়েছে। কামান স্থাপনার উঁচু মঞ্চে শক্তিশালী কামান নদীপথে আক্রমণকারীদের দিকে তাক করা থাকত। এটি মুগল জলদুর্গের একটি নতুন বৈশিষ্ট্য।

মঞ্চটিতে দুটি বৃত্তাকার অংশ আছে, অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের অংশটি যথাক্রমে ১৫.৭০ মি এবং ১৯.৩৫ মি ব্যাস বিশিষ্ট। মঞ্চটি ৬.০৯ মি উঁচু এবং বেষ্টনীপ্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত। দুর্গ প্রাচীরের পশ্চিম পার্শ্বের কোণার বুরুজগুলি পূর্বপার্শ্বস্থ বুরুজগুলি অপেক্ষা অধিক প্রশস্ত। পূর্ব বুরুজের ব্যাস ৪.২৬ মিটার এবং পশ্চিম অংশের দুটি বুরুজের ব্যাস ৬.৮৫ মিটার।

দুর্গটিতে দুটি প্রধান অংশ আছে। একটি অংশ বিশাল আয়তনের মাটির ঢিবিসহকারে গঠিত দুর্গপ্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত, যার মধ্যে গোলা নিক্ষেপের জন্য বহুসংখ্যক প্রশস্ত-অপ্রশস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র আছে। অপর অংশটি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, যা দুর্গের অভ্যন্তরে পশ্চিমাংশে নির্মিত। সুরক্ষিত দেওয়ালের অভ্যন্তরে উঁচু মঞ্চটি ব্যতীত আর কোন স্থায়ী ইমারতের সন্ধান পাওয়া যায় নি। দুর্গপ্রাচীরের সর্বত্র গুলি ছোড়ার ব্যবস্থাসহ মারলোন দ্বারা সজ্জিত; এ মারলোনগুলির গড় উচ্চতা ১ মিটার।দুর্গটিতে প্রবেশের জন্য উত্তর দিকে একটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। খিলানযুক্ত এ প্রবেশপথ একটি আয়তাকার ফ্রেমে আবদ্ধ এবং উভয়দিক পলেস্তরায় বিভিন্ন আকৃতির প্যানেল নকশায় সজ্জিত। প্রবেশপথের মূল খিলান ছিল চতুষ্কেন্দ্রিক এবং চার কোণায় রয়েছে চারটি পার্শ্ববুরুজ। হাজীগঞ্জ এবং ইদ্রাকপুরের দুর্গ প্রাচীরের পার্শ্ববুরুজগুলির সাথে এ দুর্গের পার্শ্ববুরুজগুলির মিল নেই। সোনাকান্দা দুর্গের পার্শ্ববুরুজগুলি অষ্টভুজাকার। দুর্গ নির্মাণের তারিখ সম্বলিত কোন শিলালিপি নেই। তবে সাধারণত মনে করা হয় যে, মীর জুমলার সময় দুর্গটি নির্মিত। কিন্তু এ মতের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার অন্যান্য মুগল জলদুর্গগুলির নির্মাণরীতির সাথে মিল থাকায় এটিকে সতেরো শতকের বলে মনে করা হয়। সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ সরকারের তদারকি না থাকায় দিন দিন নষ্ট হচ্ছে দুর্গটি। ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে শুধু স্মৃতি। দেয়ালগুলো নষ্ট, মাঠ বিলিনের পথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like us on Facebook